হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

ভূমিকা

প্রাক-ইসলামী যুগে আরব সমাজে পাপাচার, মিথ্যা, হত্যা, লুণ্ঠন, মদ্যপান, জুয়া, অন্যায়-অপরাধ ও নানা ধরনের সামাজিক অরাজকতা বিরাজ করছিল। এমন এক অন্ধকার সময়ে মানবতার মুক্তির দিশারী, সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পৃথিবীতে আগমন করেন। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ প্রেরিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَآ أَرْسَلْنَـٰكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَـٰلَمِي

«“আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।”
(সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)»

জন্ম ও শৈশব

হযরত মুহাম্মদ (সা.) বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে কুরাইশ গোত্রের বনি হাশিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত মতে, তিনি ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা। তাঁর জন্মের আগেই পিতা ইন্তেকাল করেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি মাতা আমিনাকে হারান। এরপর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আট বছর বয়সে দাদাও ইন্তেকাল করলে চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন।

নামকরণ

হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণের সংবাদ পেয়ে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে দেখতে আসেন। তিনি অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে তাঁকে কোলে তুলে কাবাঘরে নিয়ে যান এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। এরপর তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’, যার অর্থ ‘অধিক প্রশংসিত’।

তাঁর আরেকটি নাম ‘আহমদ’, যার অর্থ ‘অত্যধিক প্রশংসিত’। পবিত্র কুরআনেও ‘মুহাম্মদ’ ও ‘আহমদ’ নামের উল্লেখ রয়েছে।

দুধ পান ও শৈশবকাল

প্রথমে তাঁর মাতা আমিনা তাঁকে দুধ পান করান। এরপর আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবা তাঁকে দুধ পান করান। পরে হাওয়াজিন গোত্রের বনি সাদ-এর মহিলা হালিমা সাদিয়া তাঁকে দুধ পান করানোর সৌভাগ্য লাভ করেন।

হালিমা সাদিয়ার কাছে তিনি প্রায় পাঁচ বছর লালিত-পালিত হন। সেখানে তিনি তাঁর দুধ ভাইদের সঙ্গে থাকতেন এবং ছাগল চরাতেন।

দাদা ও চাচার তত্ত্বাবধানে

মাতা ও পিতার মৃত্যুর পর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে লালন-পালন করেন। দাদার মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

শৈশব থেকেই তিনি চাচাকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন। তিনি বকরী চরাতেন এবং পরবর্তীতে ব্যবসার কাজেও চাচাকে সহযোগিতা করেন।

খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স যখন ২৫ বছর, তখন মক্কার সম্মানিত ও ধনবতী নারী হযরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সততা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি মক্কাবাসীর কাছে ‘আল-আমীন’ বা ‘বিশ্বস্ত’ নামে পরিচিত ছিলেন।

হযরত খাদিজা (রা.) তাঁর ব্যবসায়িক কাজে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সততা ও বিশ্বস্ততা প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তীতে উভয়ের সম্মতিতে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়।

নবুওয়াত লাভ ও ওহি নাজিলের সূচনা

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স যখন ৪০ বছর, তখন তিনি মক্কার জাবালে নূরের হেরা গুহায় ইবাদত ও ধ্যানমগ্ন অবস্থায় সময় কাটাতেন।

সেখানেই ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম ওহি নিয়ে তাঁর কাছে আগমন করেন। প্রথম ওহির সূচনা হয়—

“اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ

«“পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা আলাক: ১)»

এর মাধ্যমে তাঁর নবুওয়াতের সূচনা হয় এবং তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর বাণী প্রচারের দায়িত্ব লাভ করেন।

মিরাজ

নবুওয়াতের পর এক বিশেষ রাতে আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ইসরা ও মিরাজের মাধ্যমে সম্মানিত করেন। তিনি মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফর করেন এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেন।

মিরাজের সময় তিনি জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন এবং মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান লাভ করেন।

ইসলামের দাওয়াত

আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান করার নির্দেশ দেন—

«“হে চাদরাবৃত! ওঠো এবং সতর্ক করো।”
(সূরা আল-মুদ্দাসসির: ১-২)»

তিনি প্রথমে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। সর্বপ্রথম হযরত খাদিজা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রা.), শিশুদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) এবং মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।

প্রায় তিন বছর গোপনে দাওয়াত দেওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন।

নির্যাতন ও ধৈর্য

ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালায়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে এসব নির্যাতন সহ্য করার শিক্ষা দেন।

হযরত বিলাল (রা.), হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) প্রমুখ সাহাবি কঠিন নির্যাতন সহ্য করেন। হযরত ইয়াসির (রা.) ও তাঁর স্ত্রী হযরত সুমাইয়া (রা.) নির্যাতনের শিকার হয়ে শাহাদাতবরণ করেন।

তায়েফ গমন

চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর কুরাইশদের নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। এ সময় সহযোগিতা ও আশ্রয়ের আশায় রাসুলুল্লাহ (সা.) তায়েফে গমন করেন। কিন্তু তায়েফবাসী তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁর প্রতি দুর্ব্যবহার করে। এমনকি তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে আহত করা হয়।

এত কষ্টের পরও তিনি তাঁদের জন্য বদদোয়া না করে হেদায়াতের আশা করেন। তাঁর ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা মানবতার জন্য এক অনন্য শিক্ষা।

মদিনায় হিজরত

মক্কার কাফিররা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেফাজত করেন। তিনি হযরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন।

পথে তাঁরা সাওর পাহাড়ের গুহায় তিন দিন অবস্থান করেন। এরপর মদিনার পথে যাত্রা করেন এবং সেখানে পৌঁছান।

মদিনায় ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা

মদিনায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। তিনি প্রথমে মসজিদে কুবা নির্মাণ করেন। এরপর মসজিদে নববী নির্মাণ করেন এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন।

তিনি ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির ভিত্তিতে একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।

মক্কা বিজয়

হুদায়বিয়ার সন্ধির পর কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা চুক্তি ভঙ্গ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। হিজরি অষ্টম বর্ষের রমজান মাসে প্রায় দশ হাজার সাহাবির বিশাল বাহিনী নিয়ে তিনি মক্কার দিকে যাত্রা করেন।

মক্কাবাসী বড় ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিজয়ী হয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং কাবা শরিফ থেকে মূর্তিগুলো অপসারণ করেন।

তিনি ঘোষণা করেন—

«“সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।”
(সূরা আল-ইসরা: ৮১)»

মক্কা বিজয়ের পরও তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ না করে অধিকাংশ মক্কাবাসীকে ক্ষমা করে দেন। তাঁর ক্ষমাশীলতা মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

বিদায় হজ

হিজরি দশম বর্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ পালন করেন। তাঁর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সাহাবি হজে অংশগ্রহণ করেন।

আরাফাতের ময়দানে তিনি ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। সেই ভাষণে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা, নারীর অধিকার, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলার শিক্ষা দেন।

এ সময় আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—

 ٱلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلْإِسْلَـٰمَ دِينًا‌ۚ

«“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”
(সূরা আল-মায়িদা: ৩)»

ইন্তেকাল

বিদায় হজের পর হিজরি ১১ সালে রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার সময়ও তিনি নামাজ ও উম্মতের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।

অবশেষে ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে, ৬৩ বছর বয়সে, তিনি মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান।

উপসংহার

হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর জীবন ছিল সত্য, সততা, আমানতদারি, ধৈর্য, ক্ষমা, ন্যায়বিচার, দয়া ও মানবতার অনন্য উদাহরণ।

তিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব সমাজকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করেন এবং বিশ্বমানবতার জন্য শান্তি, ন্যায় ও কল্যাণের পথ দেখিয়ে যান।

তাঁর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করাই একজন মুসলমানের জন্য সর্বোত্তম পথ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top