
একটা সময় কাবা শরীফে হাজরে আসওয়াদ ছিল না!
ভাবতে পারেন? যে কালো পাথরটিকে আজ মানুষ কাবা শরীফের গায়ে দেখতে পায়, সেটিই একসময় ২২ বছর ধরে কাবা থেকে নিখোঁজ ছিল!
কিন্তু কীভাবে হারিয়ে গেল এই পাথর? আর কোথায়ই বা ছিল এতগুলো বছর?
হাজরে আসওয়াদের ইতিহাস শুরু হয় বহু শতাব্দী আগে। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পাথরটি আসমান থেকে ইব্রাহিম (আ.)-এর কাছে এসেছিল। কাবা শরীফ বহুবার পুনর্নির্মাণ হয়েছে, কিন্তু হাজরে আসওয়াদ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রাচীনতম স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে টিকে আছে।
তবে এই পাথরকে ঘিরে প্রথম বড় ঘটনা ঘটে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের প্রায় একশ বছর আগে।
তখন মক্কায় জুরহুম ও খুজাআ গোত্রের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। একপর্যায়ে জুরহুম মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় কাবার ক্ষতি করার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, তারা জমজমের কূপ বন্ধ করে দেয় এবং হাজরে আসওয়াদও উপড়ে নিয়ে যায়।
পাথরটি তারা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল, সেটাও কেউ জানত না।
শেষ পর্যন্ত এক নারীর দেওয়া তথ্যের মাধ্যমে হাজরে আসওয়াদের সন্ধান পাওয়া যায়। পাথরটি উদ্ধার করে আবার কাবায় স্থাপন করা হয়।
কিন্তু হাজরে আসওয়াদের জন্য বিপদ তখনও শেষ হয়নি।
বহু বছর পর আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.)-এর সময়ে কাবায় আক্রমণ হয়। সেই আক্রমণে হাজরে আসওয়াদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তখন পাথরটিকে আরও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে এর চারপাশে রুপার ফ্রেম তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে খলিফা হারুন-অর-রশিদ সেই ফ্রেমকে আরও উন্নত করেন।
কিন্তু এরপর যে ঘটনা ঘটল, সেটাই হাজরে আসওয়াদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়।
সন ৩১৭ হিজরি। হজের সময় মক্কায় আকস্মিক হামলা চালায় কারামতিয়া নামের একটি দল।
হজরত হাজিরা তখন কাবার চারপাশে। আর সেই সময়ই শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। বহু হাজি নিহত হন, জমজমের কূপও মৃতদেহে ভরে যায় বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর তারা এমন একটি কাজ করল, যা কেউ হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি।
তারা হাজরে আসওয়াদ উপড়ে ফেলল।
শুধু উপড়েই ফেলেনি, পাথরটিকে ভেঙে টুকরো করে একটি ব্যাগে ভরে নিজেদের এলাকায় নিয়ে চলে গেল।
কাবা শরীফে তখন আর হাজরে আসওয়াদ নেই।
এক বছর গেল। দুই বছর গেল। দশ বছর গেল।
এভাবে কেটে গেল প্রায় ২২ বছর।
এই দীর্ঘ সময়ে হাজরে আসওয়াদ ছাড়া ছিল কাবা শরীফ। পাথরটি ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তারা তা ফেরত দিতে রাজি হয়নি।
অবশেষে বহু বছর পর পাথরটি আবার মক্কায় ফিরে আসে। কিন্তু এবার সেটি আর আগের সেই একটুকরো পাথর নেই।
কারণ সেটি ভেঙে ছোট ছোট টুকরো হয়ে গিয়েছিল।
তখন সেই টুকরোগুলোকে একটি বিশেষ ছাঁচের মধ্যে স্থাপন করা হয় এবং চারপাশে রুপার ফ্রেম দেওয়া হয়। আজ আমরা কাবা শরীফের গায়ে যে হাজরে আসওয়াদ দেখি, তার ভেতরে রয়েছে সেই ছোট ছোট টুকরোগুলো।
আর এখানেই গল্পটা আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে।
প্রায় ৫০০ বছর আগে অটোমান আমলে হাজরে আসওয়াদের সংস্কারের সময় এর কয়েকটি ছোট টুকরো ইস্তাম্বুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সোকল্লু মেহমেত পাশা মসজিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে এই লেকচারে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাজার বছরের ইতিহাস, অসংখ্য ঘটনা, এমনকি ২২ বছর কাবা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পরও পাথরটি আজও আমাদের সামনে আছে।
কিন্তু এই পুরো ইতিহাসের শেষে এসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা মনে করিয়ে দেওয়া হয় উমর (রা.)-এর সেই বিখ্যাত বক্তব্যের মাধ্যমে।
তিনি হাজরে আসওয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, তিনি জানেন এটি একটি পাথর। এটি নিজে থেকে কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে এটি চুম্বন করতে না দেখলে তিনিও চুম্বন করতেন না।
এটাই একজন মুমিনের বিশ্বাসের সীমারেখা।
হাজরে আসওয়াদের মর্যাদা আছে। এর ইতিহাস আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এটিকে চুম্বন করেছেন, তাই আমরাও সুন্নাহ অনুসরণ করে এটিকে সম্মান করি।
কিন্তু পাথরটি আমাদের উপকার করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না।
উপকার ও ক্ষতির মালিক একমাত্র আল্লাহ।
(লেখাটি ‘Interesting Facts About The Hajr-e-Aswad (Black Stone) | Isha Khatira | Shaykh Dr. Yasir Qadhi’ লেকচার অবলম্বনে) copy past post